আন্তর্জাতিক

চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বন্যার ‘ক্ষতিপূরণ’ দাবি নেপালের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পর জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি জোরালো করেছে নেপাল। গত সপ্তাহের ভয়াবহ দুর্যোগে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে যাচ্ছে কাঠমান্ডু।

নেপালের অভিযোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাদের দায় খুবই সামান্য হলেও এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর একটি মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশটিকে। এ কারণে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো বড় নির্গমনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া নেপালের অধিকার বলে দাবি করেছে দেশটির সরকার।

বাগমতী প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি চালানো ভোতেকোশি নদীর বন্যায় অন্তত ১ হাজার ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মানুষ। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় পাথর ও বরফ ধসের পর নদীতে পানির প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়ে এই বন্যার সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র ‘বালেন’ শাহকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে নেপাল। দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, নিউইয়র্ক সফরের এই প্রস্তাব নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেন, এই দুর্যোগের জন্য নেপাল দায়ী নয়। অথচ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি মোকাবিলা করতে হচ্ছে নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে।

তিনি বলেন, নেপাল থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ খুবই কম। তারপরও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত হিমবাহ গলে যাচ্ছে এবং পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে বড় নির্গমনকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

কান্তিপুর টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খানাল বলেন, নেপাল এখন জলবায়ু কূটনীতিতে সহায়তা পাওয়ার দাবি থেকে সরে ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিকে সামনে আনছে।

‘ক্ষতিপূরণ দান নয়, ন্যায়বিচারের দাবি’

রাসুয়ার বন্যাকে কেবল মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর বিপুল গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে নেপালের মতো দেশ যে ক্ষতির মুখে পড়ছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া তাদের দায়িত্ব।

খানালের ভাষায়, এটি কোনো দাতব্য সহায়তার বিষয় নয়; বরং আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।

তিনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করে নেপালের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।

তবে মোট কার্বন নির্গমনের হিসাবে ভারত বড় নির্গমনকারী হলেও দেশটির মাথাপিছু ও ঐতিহাসিক নির্গমন উন্নত দেশগুলোর তুলনায় কম। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৪ সালের EDGAR হিসাব অনুযায়ী, মোট নির্গমনের দিক থেকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিশ্বের শীর্ষ তিন নির্গমনকারী দেশ। মাথাপিছু নির্গমনের হিসাবে ভারতে প্রায় ৩ টন, চীনে প্রায় ১১ টন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন হয়।

ভারত অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, জলবায়ু পরিবর্তনের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান নির্গমন নয়; ঐতিহাসিক নির্গমন, মাথাপিছু নির্গমন, উন্নয়নের প্রয়োজন এবং আগে শিল্পায়নের সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর দায়ও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

‘হিমালয়ান সুনামি’তে বিপর্যস্ত নেপাল

গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি নদীর অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে। এতে রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধ্বংস হয়েছে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও। এতে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

নেপাল এই ভয়াবহ দুর্যোগকে ‘হিমালয়ান সুনামি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ।

কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি উচ্চ পার্বত্য এলাকা থেকেই বন্যার সূত্রপাত। তবে বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক কতটা—তা নিশ্চিত হতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

প্রাথমিকভাবে পাথর ও বরফের ধস, অস্থিতিশীল হিমবাহ এবং হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনকে বন্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভূমিকম্পপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের দুর্যোগ চীনের নির্মিত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে দেশটির প্রায় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এই অর্থ নেপালের মোট অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি আর্থিক সহায়তার জন্য নেপাল জাতিসংঘ-সমর্থিত ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ’-এ আনুষ্ঠানিক আবেদনও করেছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, হিন্দুস্থান টাইমস

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button