কলকাতার মুসলিম কলোনিতে এক মাস ধরে পানি সরবরাহ বন্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের উত্তর কলকাতার কাশীপুর এলাকার জ্যোতিনগর কলোনিতে প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে তীব্র খাবার পানির সংকট চলছে। চিৎপুরের এই এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস, যাদের অধিকাংশই মুসলিম। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ২৯ মে থেকে পুরো কলোনিতে পানির সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তবে কয়েকশ মিটার দূরের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নিয়মিত পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
বাসিন্দাদের দাবি, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির নির্দেশে পানি সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের। এমনকি ওই বিধায়ক তাদের ভোট না দেওয়ার কারণে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বাসিন্দারা দাবি করেছেন। বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে রিট করা হলেও এখনো কোনো কার্যকর প্রতিকার পাননি তারা।
কলোনিতে গিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদক দেখতে পান, অনেক বাড়ির সামনে রাখা পানির পাত্র খালি পড়ে আছে। প্রতিদিন পানি সংগ্রহের জন্য কয়েকজন কিশোরীকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। কখনো টাকা দিয়ে পানি কিনতে হচ্ছে, আবার কখনো পাশের হিন্দু অধ্যুষিত বস্তি থেকে অল্প পরিমাণ পানি সংগ্রহ করছেন তারা। তবে সেখানকার কিছু বাসিন্দার মধ্যেও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—মুসলিম প্রতিবেশীদের পানি দিলে তাদের নিজেদের পানির সংযোগও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
পানির সংকটের কারণে বাসিন্দাদের অনেকে বাধ্য হয়ে গঙ্গার পানি ব্যবহার করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই পানি অপরিষ্কার হওয়ায় শিশুদের শরীরে র্যাশসহ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। নদীর ঘাটে গোসল করতে গিয়ে শিশুদের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এমনকি এক বাসিন্দার মৃত্যুর পর দাফনের আগে মৃতদেহ গোসল করাতেও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আগে কলোনিতে পানির সরবরাহ স্বাভাবিকই ছিল। গত জুলাইয়ের শেষদিকে কলকাতা পুরসভা পাইপলাইন সংস্কারের কাজ শুরু করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২৮ জুলাই রাতের দিকে পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর তা চালু হয়নি। তাদের আরও দাবি, কলোনির ঠিক আগে ও পরে থাকা এলাকায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মাঝের এই অংশে পানি নেই।
কলোনির দীর্ঘদিনের হিন্দু বাসিন্দা সরস্বতী বিশ্বাসও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য, ছোট শিশুরা পানির জন্য নদীর ধারে যাচ্ছে, ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নতুন বিধায়ক স্থানীয়দের ‘বাংলাদেশি’ ও ‘অবৈধ দখলদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে নিজের দীর্ঘদিনের বসবাস ও ভোটার পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
বাসিন্দাদের একটি অংশের ধারণা, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করার ঘটনা তাদের উচ্ছেদের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। কলোনির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাসের অভিযোগ, মৌলিক নাগরিক সুবিধা বন্ধ করে বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে।
কয়েকজন নারী বিধায়কের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, বিধায়ক ধর্মীয় বিষয় নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে জমিটি কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের এবং সেখানে তারা অবৈধভাবে বসবাস করছেন—এমন বক্তব্যও দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পানি ও উচ্ছেদসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে বাসিন্দারা কলকাতা হাইকোর্টের পাশাপাশি সিটি সিভিল কোর্টেও গিয়েছেন। তবে গত ১৮ আগস্ট আদালত তাদের উচ্ছেদ থেকে কোনো বিশেষ সুরক্ষা দেয়নি বলে জানা গেছে। বাসিন্দাদের প্রশ্ন, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বসবাসের পর হঠাৎ করে কীভাবে তাদের অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা হলো।
অন্যদিকে বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেছেন, জমিটি বন্দর কর্তৃপক্ষের এবং স্থানীয়দের সঙ্গে বন্দরের বিরোধ রয়েছে। পানি সরবরাহের দায়িত্ব কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (কেএমসি), তাই এ বিষয়ে তার সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ও পোর্ট ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
পানি মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ও হাইকোর্টগুলোর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্যোতিনগর কলোনির কয়েক হাজার মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপদ পানির অভাবে দিন কাটানোয় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।



