চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ, শয্যা সংকটে রোগীদের ঠাঁই ফ্লোরে

বাংলা টিভি ডেস্ক: চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আক্রান্তদের বড় একটি অংশই চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে জেলা হাসপাতাল। নির্ধারিত শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝে, বারান্দা ও সিঁড়ির পাশে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, শুরু থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না। তবে প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কীটতাত্ত্বিক জরিপে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার প্রায় ৩৬ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। জরিপে এলাকায় এডিস মশার ঘনত্বকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে
জেলা হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (৩ অক্টোবর) সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে ৮৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩০ জন পুরুষ, ২৮ জন নারী এবং ২৫ জন শিশু রয়েছে। শিশুদের মধ্যে ১৪ জন ছেলে ও ১১ জন মেয়ে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ, ৫ জন নারী এবং ১০ জন শিশু। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি এবং কাউকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফারও করা হয়নি।
হাসপাতালের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত জেলা হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৭০২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে বহির্বিভাগে আরও ১ হাজার ৩৩০ জন রোগীর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া গুরুতর অবস্থায় ১১২ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
বেডের সংকট, মেঝেতেই চিকিৎসা
সরেজমিনে জেলা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীর চাপে পরিস্থিতি বেশ সংকটপূর্ণ। শুরুতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট শয্যা রাখা হলেও বর্তমানে শিশু, পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে।
শয্যা না পাওয়ায় অনেকে বারান্দা ও মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রচণ্ড গরম, গাদাগাদি পরিবেশ এবং মশার উৎপাতের কারণে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
পৌর এলাকার বালুবাগানের বাসিন্দা আনোয়ার বেগম জানান, কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভোগার পর চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে বেড না পাওয়ায় মেঝেতে অবস্থান করতে হচ্ছে। গরমের কারণে মশারি টাঙিয়েও থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
শিবগঞ্জের করিম জানান, তার ছেলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পর জ্বর না কমায় তাকে জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসা ভালো চললেও বেড না পাওয়ায় মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে।
অন্যদিকে পৌর এলাকার শাকিল জানান, তার পাঁচ বছর বয়সী ছোট বোনের সন্তান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় প্রয়োজনে রাজশাহীতে নেওয়ার কথা ভাবছেন তারা।
চিকিৎসক সংকটেও চলছে সেবা
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু পরিস্থিতির শুরুতে ৫০টি শয্যা নির্ধারণ করা হলেও সেপ্টেম্বর থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসক ও জনবল সংকট। ফলে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে জেলা হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, রাজশাহীতে নেওয়ার পথে বা সেখানে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় আইসিইউ সুবিধা পেতে দেরি হওয়ায় অনেক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
সচেতনতার অভাব নিয়ে ক্ষোভ
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিলেও সময়মতো মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে ফগার মেশিন দিয়ে মশা নিধনের কার্যক্রম চালানো হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি তাদের।
সমাজসেবক আসিফ ইয়াসির বলেন, জেলার কিছু এলাকায় প্রায় ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনগণের সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুতর রোগীদের স্থানীয়ভাবে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা সুজনের সভাপতি আসলাম কবির বলেন, রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে জেলা হাসপাতালের একার পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। তিনি দ্রুত পৌর এলাকার রাস্তাঘাট ও আবর্জনা পরিষ্কার, প্রয়োজনে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে কাজে যুক্ত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে জেলা হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা চালুর জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফাইজুর রহমান মানি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে প্রচারণা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। মশা নিধনের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে আরও ব্যাপক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সাংস্কৃতিক কর্মী হিরক বলেন, দেশের ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জও এখন উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় হাসপাতালের শয্যা ও চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুতর রোগীদের জেলার বাইরে পাঠানোর প্রয়োজন কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ. কে. এম. শাহাব উদ্দীন জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আইইডিসিআরের সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। তাদের একটি দল এসে আক্রান্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এরপর প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ, স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতা তৈরিতে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার বলেন, রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে আলাদা করে নির্ধারিত ডেঙ্গু শয্যা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালের চিকিৎসক সংকট থাকলেও রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন ও ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় পৌরসভা মার্চ থেকেই বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। তবে ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে আটটি টিম প্রতিদিন বিকেলে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লিফলেট বিতরণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ছাদবাগান বা বিভিন্ন পাত্রে পানি জমিয়ে রাখার কারণে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পৌরসভার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও আরও সচেতন ও সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।



