বাংলাদেশ

৩০ বছর ধরে গাছ ছাঁটাই করে সংসার চালাচ্ছেন প্রতিবন্ধী কামাল

বাংলা টিভি ডেস্ক: জন্ম থেকেই দুই পা অচল। স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর কামাল হোসেনের (৪২)। প্রতিবন্ধকতার কারণে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটানোর কথা থাকলেও বাস্তবতা তাকে ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। মাত্র ১২ বছর বয়সে হাতে দা ও দড়ি তুলে নিয়ে শুরু করেন গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ। সেই কাজ করেই কেটে গেছে প্রায় তিন দশক।

কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের পং মসূয়া খাঁ বাড়ির আব্দুল হেকিম খাঁর ছেলে কামাল। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমের মাধ্যমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রতিদিন দা, প্রায় ৪০ ফুট লম্বা দড়ি ও অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন কাজের সন্ধানে। মানুষের বাড়ি কিংবা বাগানে গাছে উঠে ডালপালা ছাঁটাই করেন।

কাজ মিললে দিনে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয় তার। তবে প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। ফলে অনিয়মিত এই আয় দিয়েই বৃদ্ধ বাবার ওষুধ, স্ত্রী-সন্তানদের খাবার, পোশাক ও পড়াশোনার খরচ চালাতে হচ্ছে তাকে।

কামালের পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধ বাবা, স্ত্রী পারভিন আক্তার, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। অন্য সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতেও তাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়।

স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে উঠেছেন কামাল। জন্মগত প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রচলিত অনেক পেশায় কাজ করার সুযোগ ছিল না তার। তবে কারও ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাননি তিনি। তাই মাত্র ১২ বছর বয়সেই গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ শুরু করেন। এরপর দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে একই পেশায় যুক্ত রয়েছেন।

কামাল হোসেন বলেন, “জন্ম থেকেই আমার দুই পা অচল। ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট করে আসছি। ১২ বছর বয়স থেকে গাছ ছাঁটাইয়ের কাজ করি। মানুষের গাছ পরিষ্কার করে যে টাকা পাই, তা দিয়েই সংসার চালাই। প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। কাজ না থাকলে খুব কষ্টে দিন কাটাতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের মতো শারীরিক শক্তি আর নেই। তবুও সংসারের দায়িত্বের কারণে কাজ করে যেতে হচ্ছে। সন্তানদের পড়াশোনা এবং বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয় তাকে।

কামালের স্ত্রী পারভিন আক্তার বলেন, “আমার স্বামী প্রতিবন্ধী হলেও কারও কাছে হাত পাততে চান না। অনেক বছর ধরে কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন। এখন বয়স বাড়ায় গাছে ওঠা ও কাজ করা তার জন্য আরও কঠিন হয়ে গেছে। সরকার যদি আমাদের একটি মুদি দোকানের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে সন্তানদের নিয়ে কোনোভাবে সংসারটা চালিয়ে নিতে পারতাম।”

স্থানীয় সমাজসেবক মোস্তফা কামাল বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কামাল কখনো ভিক্ষার ওপর নির্ভর করেননি। নিজের শ্রম দিয়ে প্রায় ৩০ বছর ধরে পরিবার চালাচ্ছেন। প্রতিদিন দা, দড়ি ও অটোরিকশা নিয়ে তাকে কাজের সন্ধানে বের হতে দেখা যায়। তার মতো মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সোহেল মিয়া বলেন, প্রায় তিন দশক ধরে গাছ ছাঁটাই করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন কামাল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার জন্য কাজকে কঠিন করে তুললেও তিনি কখনো থেমে যাননি। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছে ওঠার মতো কঠিন শ্রমের কাজ তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। কামালের জন্য একটি স্থায়ী কর্মসংস্থান কিংবা ছোট কোনো ব্যবসার ব্যবস্থা করা গেলে তার পরিবার উপকৃত হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button