বাংলাদেশ

গাইবান্ধায় ৫ বছরে ২৯ হাজার ৮৪০ তালাক, সংসার ভাঙার কারণ কী?

গাইবান্ধা প্রতিনিধি( ডিজিটাল):  একটি বিয়ে শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দুটি পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নতুন জীবনের প্রত্যাশা। ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও বোঝাপড়ার ওপর গড়ে ওঠে একটি সংসার। তবে দাম্পত্য জীবনে যখন অবিশ্বাস, কলহ, আর্থিক সংকট কিংবা নানা ধরনের অশান্তি তৈরি হয়, তখন সেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়। আর এর প্রভাব অনেক সময় শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের জীবনেও পড়ে।

গাইবান্ধায় গত কয়েক বছরের বিয়ে ও তালাকের পরিসংখ্যানে দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙনের একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেলায় মোট ৩২ হাজার ৯৬৮টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে তালাকের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৯৩৯টি, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে গাইবান্ধায় ১৬ হাজার ৫৪৬টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়। ওই বছর তালাক হয় ৫ হাজার ৬৮৯টি। ২০২২ সালে ১৬ হাজার ৩২৪টি বিয়ের বিপরীতে তালাকের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৮২টি।

২০২৩ সালে জেলায় ১৬ হাজার ৫৯১টি বিয়ে নিবন্ধিত হলেও তালাক হয় ৫ হাজার ৭৫৭টি। ২০২৪ সালে বিয়ে নিবন্ধিত হয় ১৫ হাজার ৮১৫টি এবং তালাকের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১টি। এরপর ২০২৫ সালে ১৬ হাজার ৬৬৪টি বিয়ের বিপরীতে তালাকের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯৩৯টিতে।

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেও জেলায় ৮ হাজার ৪৯৯টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে তালাক নিবন্ধিত হয়েছে ৩ হাজার ৪৮টি।

বিচ্ছেদের পেছনে নানা কারণ

সংশ্লিষ্টদের মতে, দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। মাদকাসক্তি, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব সমস্যার সঙ্গে সচেতনতার ঘাটতি যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সব বিবাহবিচ্ছেদকে একইভাবে দেখা ঠিক নয়। দীর্ঘদিনের নির্যাতন, অশান্তি বা অধিকারহীন সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা অনেকের জন্য নিরাপদ ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তও হতে পারে। তাই শুধু তালাকের সংখ্যা কমানোর দিকে নজর না দিয়ে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করাও জরুরি।

জেলা রেজিস্ট্রার জহুরুল ইসলাম বলেন, বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক কারণ থাকতে পারে। এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়া ও সামাজিক বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২, গাইবান্ধার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক ছানার মতে, বাল্যবিবাহ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষার অভাব থেকে দাম্পত্য জীবনে নানা ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। সচেতনতার অভাব এসব সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর

বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম বড় প্রভাব পড়ে সন্তানদের জীবনে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর শিশুদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা মানসিক চাপের পাশাপাশি লালন-পালন ও আর্থিক নিরাপত্তা নিয়েও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। আবার দীর্ঘদিনের কলহ বা নির্যাতনপূর্ণ পরিবেশেও বেড়ে ওঠা শিশুদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, গাইবান্ধার সাধারণ সম্পাদক রিকতু প্রসাদ বলেন, একটি দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভালোবাসার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও বোঝাপড়ার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজকেও আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

গাইবান্ধা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিবাহবিচ্ছেদ আইনগত প্রক্রিয়া হলেও এর সঙ্গে সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়ও গভীরভাবে জড়িত। তাই দাম্পত্য জীবনে কোনো সংকট দেখা দিলে শুরুতেই তা সমাধানের জন্য পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সচেতন নাগরিক গোলাম কিবরিয়ার মতে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা তৈরি হলে প্রথম থেকেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও বোঝাপড়া। তবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার নামে নির্যাতন, বৈষম্য কিংবা অধিকারহীনতা মেনে নেওয়ারও সুযোগ নেই।

গাইবান্ধায় তালাকের বাড়তে থাকা পরিসংখ্যান তাই কেবল ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সন্তান, পরিবার ও সমাজের নানা বাস্তবতা। প্রতিটি বিচ্ছেদের পেছনে রয়েছে ভিন্ন গল্প ও ভিন্ন কারণ। তাই তালাকের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি সম্পর্ক ভাঙার কারণগুলো চিহ্নিত করে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করাই হতে পারে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার কার্যকর পথ।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button