গ্রাম বাংলাদেশবাংলা

জামালপুরে অপরিকল্পিত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ: ঝুঁকিতে ২৪ মেহগনি গাছ

জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজটি হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ না করে অপরিকল্পিতভাবে প্রাচীর নির্মাণ এবং গাছের গোড়া থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়ায় দীর্ঘ দুই যুগের প্রায় ২৫টি মেহগনি গাছ চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার একটি গাছ ভেঙেও পড়েছে। প্রকৃতি ধ্বংসকারী এই কাজের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে পরিবেশ রক্ষা করে প্রাচীর নির্মাণের কাজ পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।

১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহ বিভাগের সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ। এই কলেজটি কেবল সুনামের জন্যই নয়, এর বিশাল আয়তন ও অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত। প্রতিষ্ঠার সময় শত একরের বেশি জমি থাকলেও কোনো দৃশ্যমান সীমানা প্রাচীর না থাকায় দীর্ঘ দিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী ও দখলদারদের গ্রাসে ক্যাম্পাসের আয়তন সংকুচিত হয়ে এসেছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে কলেজটির জমি রক্ষায় জামালপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৪৪৯ মিটার সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যার কাজ শুরু হয় গত সপ্তাহে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামালপুরে মানসম্মত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতির অজুহাতে ঢাকার ‘মেসার্স এম এ ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি দেওয়া হয়। তবে কাগজে-কলমে ঢাকার ঠিকাদারের নাম থাকলেও বাস্তবে কাজটি পরিচালনা করছেন জামালপুর জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম। সুরক্ষার এই প্রকল্পই এখন কলেজের সৌন্দর্য ধ্বংসের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সীমানা প্রাচীরটি প্রকৃত সীমানায় নির্মাণ না করে কলেজের মূল প্রবেশপথের পাশের সৌন্দর্যমণ্ডিত রাস্তা ও পুকুরের ধার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে তোলা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেওয়াল নির্মাণের সুবিধার্থে রাস্তার পাশে থাকা প্রায় দুই যুগের পুরনো ২৫টি মেহগনি গাছের গোড়া থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত মাটি না থাকায় গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) একটি মেহগনি গাছ ভেঙে পড়ে যায়। ফলে বাকি ২৪টি গাছও এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে গাছ ভেঙে পড়া নিয়ে অদ্ভুত ও হাস্যকর ব্যাখ্যা দিয়েছে নির্মাণকাজে নিয়োজিত পক্ষ। তাদের দাবি, পুকুরে থাকা ‘গ্রাস কার্প’ মাছ নাকি মেহগনি গাছের গোড়ায় ঠোকর দিয়ে মাটি খেয়ে ফেলেছে, যার ফলে গাছটি পড়ে গেছে! নির্মাণকারীদের এমন হাস্যকর দাবিতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদীরা। জামালপুর ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’-এর সদস্যরা পরিষ্কার বার্তা দিয়ে বলেছেন, কোনোভাবেই পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়নমূলক কাজ করা যাবে না। অতি দ্রুত গাছগুলো রক্ষা করে প্রাচীর নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ইসলামি ছাত্র আন্দোলন জামালপুর জেলা শাখার সভাপতি ও সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের শিক্ষার্থী আল আমিন রুহানি বলেন, “আমাদের কলেজের অনেক জমি দখল হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কারও কোনো নজর নেই। যেখানে প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে তো এর দরকার ছিল না। যেসব দিকে জমি দখল হচ্ছে, সেদিকে প্রাচীর নির্মাণ করলে কলেজের জমি ও গাছ দুটোই রক্ষা পেত। আমরা চাই আমাদের কলেজের পরিবেশ সুন্দর থাকুক, আর পরিবেশ সুন্দর রাখতে গাছের কোনো বিকল্প নেই।”

কাজটির দায়িত্বে থাকা জামালপুর জেলা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আব্দুল হালিম বলেন, “গাছের কোনো ক্ষতি হয়নি। যে গাছগুলোর মাটি সরে গিয়েছিল, সেগুলোকে বাঁশ দিয়ে ঠেকা দিয়েছি।”

তবে প্রশ্ন উঠেছে, দুই যুগেরও বেশি পুরনো একটি পূর্ণবয়স্ক গাছকে কি কেবল বাঁশ দিয়ে ঠেকা দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব?

শুক্রবার সরেজমিন পরিদর্শনের সময় নির্মাণকাজে নিয়োজিত হেড মিস্ত্রির (ওস্তাগর) সাথে কথা বললে তিনিও একই অদ্ভুত ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করেন, ‘গ্রাস কার্প’ মাছ মাটি খেয়ে ফেলেই গাছটি পড়েছে।

জামালপুর জেলা পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, “পরিবেশ নষ্ট করে কোনো নির্মাণকাজ চালানো যাবে না। সবার আগে গাছ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা ভাবতে হবে। যে গাছগুলো নষ্ট হয়েছে এবং যেগুলো হুমকির মুখে রয়েছে, সেগুলোকে মাথায় রেখেই কাজ করা উচিত ছিল। বাকি গাছগুলোর যাতে আর কোনো ক্ষতি না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে কাজ করার জন্য আমি ঠিকাদারদের আহ্বান জানাচ্ছি।”

এ বিষয়ে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আব্দুল বার্সেদ বলেন, “আমি এই কলেজে গত মাসে যোগদান করেছি। প্রকল্পটি আমার যোগদানের আগেই গৃহীত হয়েছিল। গাছের বিষয়ে আমি ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারকে বলেছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে না জানিয়েই কাজ শুরু করেছে। গাছ পড়ার কারণে কলেজের বিদ্যুৎ লাইনে সমস্যা হয়েছিল এবং এক দিন ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। আমার মনে হয়, বাকি গাছগুলো বেশি দিন বাঁচবে না।”

এ বিষয়ে জামালপুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়িতা অধিকারী বলেন, “কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের যে জায়গাগুলোর দিকে বাউন্ডারি ওয়াল করার চাহিদা দিয়েছেন, আমরা সেদিক দিয়েই কাজ করছি। কাজটি করার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল, তাই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে একটি গাছ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা চাই না এভাবে আর কোনো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হোক। বাকি কাজগুলো করার সময় গাছ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে আমরা বিশেষভাবে খেয়াল রাখব।”

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button