স্কুলে নামাজ বাধ্যতামূলক করতে গিয়ে বিপদে বাগেরহাটের হিন্দু শিক্ষক

বাংলা টিভি ডেস্ক: বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায়কে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে নামাজসংক্রান্ত একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। বক্তব্যের একটি অংশ প্রচার করে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেছেন, ভিডিওটি পুরো বক্তব্যের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে না।
ঘটনার সূত্রপাত ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে। সেখানে বক্তব্য দেওয়ার সময় সমর কৃষ্ণ রায় মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ আদায়ের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়ার কথা বলেন। তবে তাঁর দাবি, কথাটি বলার সময় অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যায়। পরে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন।
প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যের মাত্র ছয় সেকেন্ডের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নিজের বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ ভিডিওও তিনি সংবাদমাধ্যম কালবেলাকে পাঠিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, রোববার (১১ অক্টোবর) ঘটনাটির প্রতিবাদে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে। তাদের দাবি, বক্তব্যের পুরো প্রেক্ষাপট সামনে এনে সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম জানান, সমর কৃষ্ণ রায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলিম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ আদায়ে উৎসাহিত করেন এবং তাদের জন্য আলাদা নামাজের কক্ষের ব্যবস্থা করেছেন। পাশাপাশি প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার জায়নামাজ কেনার কথাও জানান তিনি।
সেলিম আরও বলেন, বিদ্যালয়ের পুরোনো খাতা ও বই বিক্রির বিষয়টি নিয়েও যেন বিভ্রান্তি না ছড়ায়। তাঁর দাবি, কমিটির অনুমোদন ও রেজুলেশন অনুযায়ী প্রায় ৬০০ কেজি পুরোনো খাতা ও বই ১০ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল। বিক্রির অর্থ ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠান আয়োজনের কাজে ব্যয় করা হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে বোর্ডের প্রকাশিত পাঠ্যবই বিক্রি করা হয়নি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নীলা, নবম শ্রেণির ছাত্রী তাবাসসুম এবং আয়েশা তাহাসিন পুথিও প্রধান শিক্ষকের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে। তাদের দাবি, সমর কৃষ্ণ রায় ছাত্রীদের নামাজ পড়তে উৎসাহিত করেন এবং নামাজের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছেন। ভাইরাল ভিডিওতে বক্তব্যের একটি অংশ তুলে ধরায় ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে বলেও তারা মনে করে।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা শারমিন খাতুন বলেন, প্রধান শিক্ষক ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করেন না। তিনি ছাত্রীদের ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে উৎসাহিত করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে নামাজের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক পরীক্ষায় নম্বর কমানোর কথাও বলেছিলেন।
সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ সিদ্দিকীও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি জানান, মুসলিম ছাত্রীদের নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সেটি সাজাতে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় বলেন, মুসলিম ছাত্রীদের নামাজের জন্য আলাদা কক্ষ তৈরি করা হয়েছে এবং প্রায় ২২ হাজার টাকার জায়নামাজ কেনা হয়েছে। তাঁর দাবি, বক্তব্য দেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যাওয়ায় কথাটির অর্থ বদলে গেছে। এ অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। কাউকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না বলেও জানান।
অনুষ্ঠানের ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, পুরোনো খাতা ও নোট বিক্রি করে পাওয়া ১০ হাজার ৫০০ টাকা কমিটির অনুমোদন অনুযায়ী অনুষ্ঠানে ব্যয় করা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষক ও ছাত্রীদের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করা হয় এবং বিদ্যালয়ের সভাপতি আর্থিক সহায়তা দেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠান আয়োজন করতে মোট প্রায় ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা খরচ হয়েছিল।
এ বিষয়ে ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, তিনি প্রধান শিক্ষকের পুরো বক্তব্য দেখেছেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে, কথাটি অসাবধানতাবশত বলা হয়েছে এবং পরে প্রধান শিক্ষক নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছেন।
ইউএনও সংবাদ প্রকাশের আগে ঘটনার সত্যতা ও পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর মতে, কোনো বক্তব্যের অংশবিশেষের পরিবর্তে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ।



