১৮ বছর ধরে চালু হাসপাতালে ১৫ বছরই বন্ধ সিজারিয়ান অপারেশন

বাংলা টিভি ডেস্ক: চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান অপারেশন। গাইনি, সার্জারি ও অ্যানেসথেশিয়া বিভাগের চিকিৎসক সংকটের কারণে হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ১৮ বছর আগে চালু হওয়া এই হাসপাতালে গত প্রায় ১৫ বছর ধরে সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে প্রসূতি মা ও তাঁদের স্বজনদের। বাধ্য হয়ে চিকিৎসার জন্য ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরাঞ্চল অধ্যুষিত এই উপজেলার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান আশ্রয় সরকারি এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে এখানকার মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৩১ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ২১টি। এর মধ্যে কাগজে-কলমে পাঁচটি পদ শূন্য দেখানো হলেও বাস্তবে চিকিৎসক নেই সাতটি পদে। শূন্য পদগুলোর মধ্যে রয়েছে গাইনি, সার্জারি, অ্যানেসথেশিয়া ও মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার, ডেন্টাল সার্জন ও সার্জন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কখনো গাইনি চিকিৎসক থাকলেও সার্জারি কিংবা অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না। আবার সার্জন থাকলেও গাইনি চিকিৎসকের অভাব দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় তিন বিভাগের চিকিৎসক একসঙ্গে না থাকায় অপারেশন থিয়েটার থাকা সত্ত্বেও সিজারিয়ানসহ বিভিন্ন অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না।
২০০৮ সালে উপজেলার মরাদোন এলাকায় ৩১ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় মানুষের চাহিদা বিবেচনায় হাসপাতালটির ৫০ শয্যার অবকাঠামো তৈরি করা হলেও এখনো ৫০ শয্যার কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন মেলেনি।
এদিকে হাসপাতালে একজন গাইনি চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ থাকলেও তিনি তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ডেপুটেশনে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে গাইনি চিকিৎসক ছাড়াই চলছে হাসপাতালটির কার্যক্রম।
শুধু চিকিৎসক সংকটই নয়, দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও এক্স-রে মেশিন। এতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতেও সমস্যায় পড়ছেন রোগীরা। বিশেষ করে গ্রামীণ ও চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
হাসপাতালের পাশের একটি ফার্মেসির কর্মী জানান, অনেকেই না জেনে প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান কিংবা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য এই হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় পরে তাঁদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়। এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে যেতে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
ইসলামাবাদ এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ইব্রাহিম খলিল জানান, তাঁর বোনের প্রসববেদনা শুরু হলে অনেক কষ্টে তাঁকে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় শেষ পর্যন্ত ছেংগারচর বাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, চরাঞ্চলসমৃদ্ধ এই উপজেলার অনেক অসচেতন প্রসূতি মা এখনো সন্তান প্রসবের জন্য ধাত্রীর ওপর নির্ভর করেন। এমন বাস্তবতায় সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে গাইনি চিকিৎসা ও সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক।
হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন কুমার দাশ জানান, হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত থাকায় পদটি আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য হিসেবেও দেখানো যাচ্ছে না। গাইনি চিকিৎসক না থাকায় এলাকার প্রসূতি মায়েরা হাসপাতালটির সেবা নেওয়া থেকে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছেন।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ, যন্ত্রপাতি সচল করা এবং অস্ত্রোপচার কার্যক্রম পুনরায় চালু না হলে মতলব উত্তরের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।



