একই রাস্তা সকালে উদ্বোধন করলেন জামায়াতের এমপি, বিকালে বিএনপির সাবেক এমপি

বাংলা টিভি ডেস্ক: চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী একটি সড়ক একই দিনে দুইবার উদ্বোধনের ঘটনা ঘটেছে। সড়কটি সকালে উদ্বোধন করেছেন জামায়াতের বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি), আর বিকালে পুনরায় তা উদ্বোধন করেছেন বিএনপির সাবেক এমপি। এ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জের ধরেই এমন উদ্বোধন, পাল্টা উদ্বোধনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে এলজিইডি বলছে, কোনোটিই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন নয়।
জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী বিওপি ক্যাম্প থেকে ফরিদপুর বিওপি ক্যাম্প পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি। তিন কিলোমিটার ৫৫০ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৩১ টাকা। সড়ক নির্মাণ হলে সীমান্তবর্তী এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির টহল ও সীমান্তে নজরদারিতে সুবিধা হওয়ার পাশাপাশি পদ্মা নদীতীরবর্তী সীমান্ত এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে।
এদিকে, কাজ কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হলেও রোববার (১ নভেম্বর) সকালে সড়কটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল। একই দিনে বিকালে সেই সড়কটি পুনরায় উদ্বোধন করেন এই আসনে বিএনপির সাবেক এমপি বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ।
সকাল ও বিকালে উদ্বোধনের সময় এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি একে অপরের প্রতি সমালোচনা করতে দেখা যায় বর্তমান ও সাবেক এমপিকে। তবে বর্তমান বা সাবেক এমপি উদ্বোধন করলেও কোনোটিই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন নয় বলে জানিয়েছেন এলজিইডির কর্মকর্তারা। এমনকি সাবেক ও বর্তমান এমপি উদ্বোধনের দাবি করলেও সড়কটির নির্মাণকাজ প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সকালে এমপি বুলবুল উদ্বোধনের সময় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নামসহ ব্যানার থাকলেও বিকালে সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হারুনুর রশীদ উদ্বোধন করার সময় তা ছিল না। সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ ফিতা কেটে উদ্বোধন করেন। তবে এলজিইডির কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা উভয় সময়েই উপস্থিত ছিলেন।
এ নিয়ে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও পাওয়া যায়নি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুলকে। তবে উদ্বোধন শেষে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘আপনি (হারুনুর রশীদ) যদি চান চাঁপাইনবাবগঞ্জে যত ভালো কাজ হবে, এর উদ্বোধনে আমার সঙ্গে থাকতে চান, ওয়েলকাম, আপনি থাকবেন আমার সঙ্গে। কারণ আমি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সঙ্গে জেলাকে সবাই মিলে এগিয়ে নিতে চাই। সুতরাং, আমি যেই কাজ উদ্বোধন করব, আপনি আমার সঙ্গে থাকেন, কোনো অসুবিধা নাই। আপনি জেলা পরিষদের প্রশাসক, সেই বরাদ্দ নিয়ে থাকেন। আপনার যে বরাদ্দ আসবে, কী বাজেট আসছে, আপনি কোন খাতে খরচ করছেন এবং করবেন, সেটি জেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে খোঁজখবর নেওয়ার দায়িত্ব এমপির আছে। এটি শুধু আমার একার নয়, সারা বাংলাদেশের সব এমপির আছে। সুতরাং, আপনার তদারকি করা আমার দায়িত্ব। কিন্তু আমার কোনো কাজের দিকে তাকানো আপনার দায়িত্ব না।’
রোববার (১ নভেম্বর) সকালে সড়কটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল/ ছবি: স্টার নিউজ
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ৫ বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনে যা কাজ হবে, তার সব কাজের দায়িত্ব হচ্ছে এমপির। যেটা এমপির কাজ, এমপিকে করতে দিবেন। ৬২ হাজার ৬১৯ ভোট বেশি পেয়ে আমি নির্বাচিত হয়েছি, এতগুলো মানুষ আমাকে আপনার থেকে বেশি সমর্থন দিয়েছে। আপনার ভোট আপনি কিভাবে পেয়েছেন, সেটি জনগণ জানে। জনগণের কোন অধিকার নিয়ে আপনি (সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদ) হোন আর যেই হোন, ছিনিমিনি খেললে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করব। এখানে এলজিইডির কাজ হবে, আর আপনি উদ্বোধন করবেন। আমার কাজ, আর আপনি উদ্বোধন করবেন। এই এখতিয়ার আপনাকে কে দিয়েছে, জনগণ দেয়নি।’
একই সড়ক বারবার উদ্বোধনের কারণ জানতে চাইলে এ বিষয়ে মুঠোফোনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘এ নিয়ে এমপি বুলবুলকে প্রশ্ন করুন। তিনিই বলতে পারবেন। আমি নিজে এসব রাস্তা-ঘাটের বরাদ্দ নিয়ে আসছি, আর তিনি (এমপি বুলবুল) গিয়ে উদ্বোধন করছে। বরাদ্দ-প্রকল্প আমি নিয়ে আসছি, আর ব্যানার টাঙিয়ে গিয়ে উদ্বোধন বললেই হলো? এত ছ্যাঁচড়ামি করার কোনো দরকার নাই। একজন এমপির প্রটোকল তাকে বুঝতে হবে। বরাদ্দ নিয়ে আসার সুবাদে আমি সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে পরিদর্শন বা উদ্বোধন করতেই পারি।’
এদিকে, উদ্বোধন-পরবর্তী আলোচনা সভায় সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের নতুন এমপিকে (নুরুল ইসলাম বুলবুল) বলব, বহু কাঁচা রাস্তা আছে ভাই, তুমি টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসে কাজ করো, তোমার বরাদ্দ আনার ক্ষমতা আমরা দেখতে চাই। মানুষ চায়, এখানে আরও কাজ হোক, উন্নয়ন হোক, কোনো অসুবিধা নাই। কথাবার্তা বলার সময় খুব সাবধানে বলবা, উল্টাপাল্টা কথা বললে, জনগণ কিন্তু সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এরকম ছ্যাঁচড়া এমপি আমি দেখিনি। এত ছ্যাঁচড়া এমপি বাংলাদেশে আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই। সড়কটি আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল, বাস্তবায়নেও আমার অনেক সহযোগিতা ছিল।’
সড়ক নির্মাণের ঠিকাদার মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘বর্তমান ও সাবেক এমপি উদ্বোধনের দুই সময়ই আমি উপস্থিত ছিলাম। এ নিয়ে আমাদের তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। উদ্বোধন ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি পরিদর্শনে এলে, আমাদেরকে থাকতেই হয়। সেই সুবাদেই আমার থাকা।’
এ নিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোন রিসিভ করেননি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হারুন অর রশীদ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম জানান, এলজিইডির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। এটি হলে আমরা ফলক বসাতাম। কিন্তু তা করা হয়নি। বর্তমান ও সাবেক এমপি দুজনই তদারকির কাজে গিয়েছিলেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা পরিদর্শন বা তদারকিতে গেলে আমরা সেখানে উপস্থিত থাকি। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে বলে জানান তিনি।



