ইটের দেওয়ালঘেরা ছোট্ট ঘরে ১২ বছর, চিকিৎসার অভাবে যুবকের বন্দিজীবন

বাংলা টিভি ডেস্ক: চারদিকে ইটের দেয়াল, মাথার ওপর টিনের ছাউনি। ছোট্ট ঘরটির বাইরে যাওয়ার স্বাভাবিক কোনো দরজা নেই। জানালার মতো একটি ছোট অংশে লাগানো রয়েছে লোহার গ্রিল। সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়েই দেওয়া হয় খাবার। এভাবেই দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন সামিম হাওলাদার (৩৮)।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের সাড়ে পাঁচ আনী গ্রামের বাসিন্দা তিনি। একসময় মাদরাসায় পড়াশোনা করে দাখিল ও আলিম পাস করেছিলেন। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। বিয়ে করে সংসারও শুরু করেছিলেন। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। কিন্তু হঠাৎ মানসিক অসুস্থতায় বদলে যায় তাঁর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। একপর্যায়ে স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান। আর সামিমের জীবন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে বাড়ির পাশের ছোট্ট একটি ঘরে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ বছর আগে সামিমের আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। প্রথম দিকে তিনি গ্রামের বিভিন্ন স্থানে মানুষকে মারধর করতেন। পরে পরিবারের সদস্যদের প্রতিও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। বাবা-মা ও ভাইয়েরাও তাঁর আক্রমণের শিকার হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রথমে তাঁর পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হতো। পরে পরিবারের সদস্যরা বাড়ির পাশে ইটের দেয়াল ও টিনের ছাউনি দিয়ে একটি ছোট ঘর তৈরি করেন। এরপর থেকেই সেখানে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঘরটির সামনে রয়েছে লোহার গ্রিল। বাইরে থেকে সেই গ্রিলের ফাঁক দিয়েই তাঁকে খাবার দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের এই পরিবেশে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন সামিম। কেউ ডাকলে গ্রিলের কাছে এসে কথা বলেন। এমনকি গ্রিলের ভেতর থেকেই কোরআন তিলাওয়াত করে শোনান। তবে স্বাভাবিক মানুষের মতো বাইরে বের হওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা কিংবা মুক্ত পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ তাঁর নেই।
প্রতিবেশী হৃদয় বলেন, সামিম একসময় এলাকার ভালো মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। হঠাৎ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। কী কারণে তাঁর এমন অবস্থা হয়েছে, তা তাঁদের জানা নেই।
সামিমের চাচাতো ভাই বাবুল হোসেন জানান, পড়াশোনা শেষ করে সামিমের সংসার জীবন ভালোই চলছিল। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সামনে যাকে পেতেন, তাকেই মারধর করতেন। এমনকি নিজের মেয়েকেও দা নিয়ে ধাওয়া করেছিলেন বলে জানান তিনি। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের লোকজনও তাঁর আক্রমণের শিকার হন। এ অবস্থায় এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করেই তাঁকে ঘরবন্দি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে দাবি করেন বাবুল।
এদিকে ছেলের চিকিৎসার জন্য জীবনের শেষ সম্বলটুকুও ব্যয় করেছেন বাবা সত্তরোর্ধ্ব কালাম হাওলাদার। জমি বিক্রি করেছেন, মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও ছেলের অবস্থার উন্নতি হয়নি। বর্তমানে নিজেও পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
আক্ষেপ করে কালাম হাওলাদার বলেন, ‘ছেলের চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করেছি, মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করেছি। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছি। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাইনি। এখন আমিও প্যারালাইজড। কী করব, বুঝতে পারছি না।’
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে একজন যুবকের এমন মানবেতর জীবনযাপনের খবর জানার পর তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা উল হুসনা বলেন, আলিম পাস করা একজন মানুষ মানসিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ঘরবন্দি রয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামিমের জন্য যথাসাধ্য সহযোগিতা করা হবে। প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।



