এক হিন্দু পরিবারকে আগলে রেখেছে ৩০০ মুসলিম পরিবার

বাংলা টিভি ডেস্ক: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে প্রায় ৩০০ মুসলিম পরিবারের বসবাস। এর মাঝেই দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে একটি হিন্দু পরিবার। ধর্ম আলাদা হলেও তাদের মধ্যে নেই কোনো বিভেদ কিংবা দূরত্ব। বরং বছরের পর বছর পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে একসঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন তাঁরা। সুখে-দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে গড়ে তুলেছেন সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত।
উপজেলার নরসিংহপাড়া গ্রামে প্রায় ৩০০ মুসলিম পরিবারের পাশাপাশি বসবাস করছে একটি হিন্দু পরিবার। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের এই সহাবস্থানে কখনো সাম্প্রদায়িক বিরোধ কিংবা ধর্মীয় বিভেদের প্রভাব পড়েনি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা সামাজিক নানা পরিবর্তনের মধ্যেও প্রতিবেশীদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
গ্রামটিতে রয়েছে একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা, কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ এবং সিদ্ধেশ্বরী মন্দির। চারপাশে বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝে জেগে থাকা গ্রামটি দূর থেকে দেখতে বেশ মনোরম। বর্ষাকালে পানিতে চারদিক ডুবে গেলে নৌকাই হয়ে ওঠে বাসিন্দাদের চলাচলের প্রধান বাহন।
স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ আলমাস আলী বলেন, এই গ্রামে হিন্দু-মুসলিম সবাই দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করছেন। এখানে স্কুল, মাদ্রাসা, কবরস্থান ও মন্দির রয়েছে। প্রায় ৩০০ মুসলিম পরিবারের সঙ্গে একটি হিন্দু পরিবারও মিলেমিশে রয়েছে। সবার মধ্যে ভালো সম্পর্ক বজায় আছে।
গ্রামের হিন্দু পরিবারের সদস্যরাও প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁদের সুসম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করছেন তাঁরা। কখনো ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো ধরনের অন্যায় বা বৈষম্যের শিকার হতে হয়নি। বরং প্রয়োজনের সময় সবাই একে অপরের পাশে দাঁড়ান।
পরিবারের সদস্য বাপ্পি চক্রবর্তী বলেন, ‘এই গ্রামে আমার বাপ-চাচা, দাদুরা বসবাস করে গেছেন। আমরা হিন্দু-মুসলমান বন্ধুর মতো একসঙ্গে চলাফেরা করি। আমাদের জমিজমা আছে, মন্দির আছে। এখানে নিয়মিত পূজা করি। কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।’
পরিবারের প্রবীণ সদস্য কালিপদ চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কারও ঝগড়া-বিবাদ নেই। কেউ আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন না, আমরাও করি না। আমার জন্ম এই গ্রামে। আমার বাবা-ঠাকুরদারাও এখানে বসবাস করেছেন। তাঁদের অনেকেই চলে গেছেন। আমারও বয়স হয়েছে। প্রায় দেড়শ বছর ধরে আমাদের পরিবারের বসবাস এখানে। হিন্দু-মুসলিম সবাই একসঙ্গেই চলাফেরা করি।’
শুকলহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তুষার চক্রবর্তীর জন্মও এই গ্রামে। নিজের বেড়ে ওঠার স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নরসিংহপাড়া গ্রামেই আমার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই সবাইকে একসঙ্গে মিলেমিশে বড় হতে দেখেছি। আমাদের ধর্ম ও জাতিগত পরিচয় আলাদা হলেও পারস্পরিক সম্পর্ক খুব ভালো। আমরা সবাই ভালো আছি।’
গ্রামের দীর্ঘদিনের এই সম্প্রীতির কথা জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও। উল্লাপাড়া উপজেলার ৪ নম্বর বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও নরসিংহপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এই গ্রামেরই মানুষ। এখানে প্রায় ৩০০ মুসলিম পরিবার রয়েছে। পূর্বপুরুষের আমল থেকেই একটি হিন্দু পরিবারও আমাদের সঙ্গে বসবাস করছে। তাদের সঙ্গে চলাফেরা কিংবা ওঠাবসায় কখনো কোনো দ্বন্দ্ব হয়নি। এই গ্রামে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই।’
ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও মানবিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নরসিংহপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে যে সহাবস্থানের নজির তৈরি করেছেন, তা স্থানীয় সম্প্রীতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।



