আন্তর্জাতিকএশিয়া

ভারতের সাধারণ নির্বাচন: ছয় সপ্তাহ ধরে ভোটগ্রহণ

ভারতের সাধারণ নির্বাচন শুরু হয়েছে আজ শুক্রবার (১৯ এপ্রিল)। ভারতের নির্বাচনকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্বাচন।প্রায় ৯৭ কোটি ভোটার ভোট দেওয়ার মাধ্যমে দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৫৪৩ জন সদস্যকে বেছে নেবেন।

আজ ভোটগ্রহণ শুরু হলেও ভোটগণনা পর্যন্ত সময় লাগবে ছয় সপ্তাহের বেশি।এবারের নির্বাচনের ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত ৪৪ দিন সময় নিয়েছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।

এ বছর ভোটগ্রহণ হবে মোট সাত দিন। শুক্রবার প্রথম ধাপে দেশটির ১০২টি নির্বাচনী এলাকায় ভোটাররা ভোট দেবেন।

১ জুন শেষ ভোটগ্রহণের দিন ৫৭টি নির্বাচনী এলাকায় ভোটাররা ভোট দেবেন। ৪ জুন একসঙ্গে সব ভোট গণনা হবে।

এই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য ভোটে লড়ছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে  মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি আর তার জোট সঙ্গীদের এগিয়ে রেখেছে।

বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের বিপরীতে লড়াই করছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট। কংগ্রেসসহ দু ডজনেরও বেশি বিরোধী দল এই জোটে রয়েছে।

সংসদের নিম্ন কক্ষ লোকসভার সদস্যদের বেছে নেওয়ার এই নির্বাচন হচ্ছে এক তিক্ত পরিবেশের মধ্যে।বিরোধীরা অভিযোগ করছে যে তারা পক্ষপাতিত্বের শিকার হচ্ছে, কারণ কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি অনেক বিরোধী নেতাদের বাড়িতেই তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে।

কংগ্রেস বলছে ছয় সপ্তাহ ধরে আয়কর বিভাগ তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে রেখেছে, যার ফলে নির্বাচনী প্রচারণার খরচ চালাতে তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

আবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো বেশ কয়েকজন বিরোধী নেতাকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই সব দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্য তারা সকলেই অস্বীকার করছেন।

বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনকে হস্তক্ষেপ করার জন্য আবেদন করেছিল। সেই নির্বাচন কমিশনও আবার তাদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে যে তারা সব দল এবং প্রার্থীদের সমান নজরে দেখছে, পক্ষপাতিত্ব করছে না তারা।

পরিসংখ্যান মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে: প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত বিশ্বের সবথেকে জনবহুল দেশ। এরকম একটা দেশের নির্বাচন সংক্রান্ত সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যেতে পারে।

লোকসভার ৫৪৩ জন সদস্যকে নির্বাচন করতে ছয় সপ্তাহ ধরে সাত দফায় ভোট নেওয়া হবে।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হবে ৪ জুন। এই নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা ৯৬ কোটি ৯০ লক্ষ।

একটা ধারণা দেওয়ার জন্য বলা যেতে পারে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল আর ফ্রান্সের জনসংখ্যার প্রায় সমসংখ্যক মানুষ ভারতের নির্বাচনের ভোটার তালিকায় রয়েছেন।

ওই সব দেশগুলোর মিলিত জনসংখ্যা ভারতের ভোটারের সংখ্যার থেকে সামান্য কম, তাই ওই দেশগুলির সঙ্গে বেলজিয়ামের জনসংখ্যাও জুড়ে দেওয়া যেতে পারে।

এবারের ভোটারদের মধ্যে ৪৯ কোটি ৭০ লক্ষ পুরুষ এবং ৪৭ কোটি ১০ লক্ষ নারী।

প্রথমবার ভোট দেবেন, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮-১৯ বছর, এমন ভোটার এক কোটি ৮০ লক্ষ।

প্রবীণ ভোটার, যাদের বয়স ৮৫ থেকে ৯৯ বছর, এরকম ৮২ লাখ মানুষের নাম আছে ভোটার তালিকায়।

সব জায়গায় পৌঁছবেন ভোটকর্মীরা: নিরাপত্তা আর ভোটের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণেই নানা দফায় ভোট করানো হচ্ছে।

বয়স্ক আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে যাদের, তাদের বাড়িতে গিয়েও ভোট নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে নির্বাচন কমিশন।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমারের কথায়, “ভারতের প্রতিটি কোনায় গণতন্ত্রকে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য” সারা দেশে ১৫ লক্ষ ভোট কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে।

রাজীব কুমার বলছেন, “একজন ভোটার জঙ্গলে বাস করুন অথবা তুষারাবৃত পাহাড়ে, আমাদের কর্মীরা বাড়তি পরিশ্রম করে হলেও প্রত্যেক ভোটারের কাছে পৌঁছবেন। আমরা ঘোড়া আর হাতি বা খচ্চরের পিঠে চেপেও যেমন যাব, তেমনই হেলিকপ্টারেও যাব। আমরা সব জায়গায় পৌঁছব।“

বেশিরভাগ ভোটগ্রহণ কেন্দ্রই স্কুল, কলেজ বা কমিনিউটি সেন্টারে হলেও বেশ কিছু অদ্ভুত জায়গাও বাছা হয়েছে বুথ তৈরি করার জন্য – যার মধ্যে রয়েছে জাহাজের কন্টেইনার, পাহাড়ের চূড়া বা জঙ্গলের মধ্যেও বুথ হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন যখন বলে যে, ‘প্রত্যেক ভোটারই গুরুত্বপূর্ণ’ সেটা শুধু কথার কথা নয়। বিগত লোকসভা নির্বাচনে, ২০১৯ সালে পাঁচ জন ভোট কর্মী বাসে চেপে আর তার পরে পায়ে হেঁটে দুদিন ধরে পৌঁছিয়েছিলেন এমন একটি বুথে, যেখানে মাত্র একজন ভোটার ছিলেন।

উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের ওই ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের একাকী ভোটার ছিলেন একজন ৩৯ বছর বয়সী নারী।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে রাজ্য: রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হল উত্তরপ্রদেশ। সে রাজ্যে ভোটার রয়েছেন প্রায় ২৪ কোটি। এটিই ভারতের সবথেকে জনবহুল রাজ্য আর এখান থেকেই সংসদে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সদস্য নির্বাচিত হন।

বিশ্লেষকরা বলেন, দিল্লি যাওয়ার পথটা উত্তর প্রদেশ হয়েই যায়। এই রাজ্যে যে দল ভাল ফল করে, সাধারণত: ভারত শাসন করে থাকে তারাই। এই রাজ্য থেকে ভারতের আটজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালে যখন প্রথম ক্ষমতায় আসেন, সেবছর বিজেপি উত্তরপ্রদেশের ৮০টির মধ্যে ৭১ টি আসনে জিতেছিল। পরের বার, ২০১৯ সালে অবশ্য বিজেপির জেতা আসনের সংখ্যাটা কমে ৬২ হয়েছিল। মি. মোদী ২০১৯ সালে প্রাচীন শহর বারাণসী আসন থেকে জিতেছিলেন, এবারও তিনি ওই আসন থেকেই ভোটে লড়ছেন।

উত্তর প্রদেশ থেকে যেমন সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, অন্যদিকে রয়েছে সিকিম, নাগাল্যাণ্ড, মিজোরাম আর আন্দামান, লাক্ষাদ্বীপ এবং লাদাখের মতো কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলগুলি, যার প্রতিটি থেকে মাত্র একজন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

অন্য যেসব রাজ্য এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তার মধ্যে আছে ৪২ টি আসনের পশ্চিমবঙ্গ, ৪৮টি আসনের মহারাষ্ট্র, ৪০ আসনের বিহার এবং ৩৯টি আসনের তামিলনাডু। বিবিসি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। বাংলা টিভি

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button