আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানে ঐতিহাসিক রামলীলা মন্দির বন্ধ ঘোষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি হিন্দু মন্দির ভাঙার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদের পর স্থাপনাটি সিলগালা করেছে কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আপত্তির মুখে ডেরা ইসমাইল খান শহরের ঐতিহাসিক রামলীলা মন্দিরটি সরকারি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরে মন্দিরটি সিলগালা করে ইভাকুই ট্রাস্ট প্রপার্টি বোর্ড (ইটিপিবি)।

বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) বরাতে এ খবর প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়া টুডে।

কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার স্থানীয় প্রশাসন মন্দিরটি নিজেদের হেফাজতে নেয়। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে শহরের রহিম বাজার এলাকায় মন্দিরের ভবন ভাঙার কাজ শুরু হলে স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দিয়ে তা বন্ধ করে দেন।

ডেরা সিভিল সোসাইটি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সোহেল আহমেদ আজমি জানান, মন্দির ভাঙার খবর পেয়ে তিনি অন্য বাসিন্দাদের নিয়ে সেখানে যান। এ সময় এক ব্যক্তি ভবনটি ভাঙার কাজের ঠিকাদার হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন বলে জানান তিনি।

পরে স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা একত্র হয়ে মন্দিরটি ভাঙার উদ্যোগের প্রতিবাদ জানান। তাঁরা স্থাপনাটির মালিকানা এবং সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের বৈধতা খতিয়ে দেখার দাবি করেন। পাশাপাশি বিষয়টি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে উত্থাপনের জন্য জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানান।

ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ

পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেরা ইসমাইল খান শহরের প্রায় ৪০০টি ভবনকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসম্পন্ন সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইটিপিবি।

পাকিস্তান সরকারের এই সংস্থাটি দেশভাগের পর ভারতে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ট্রাস্টভুক্ত সম্পত্তি পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করে। দেশটির বিভিন্ন হিন্দু ও শিখ ধর্মীয় স্থাপনাও সংস্থাটির দায়িত্বের আওতায় রয়েছে।

অল পাকিস্তান হিন্দু রাইটস মুভমেন্টের চেয়ারম্যান হারুন সারাব ডায়াল আশা প্রকাশ করেছেন, প্রদেশটির বর্তমান প্রশাসনের অধীনে হিন্দুদের ধর্মীয় স্থাপনাগুলো বাড়তি সুরক্ষা পাবে। একই সঙ্গে ২০১৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ধর্মীয় সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল বা বিক্রির অভিযোগগুলোর তদন্ত দাবি করেছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণকর্মীদের মতে, রামলীলা মন্দির ডেরা ইসমাইল খানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর আগে একই স্থানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের বিরোধিতার মুখে তা বাধার সম্মুখীন হয়েছিল।

এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিলোট শরিফের মন্দির কমপ্লেক্সও রয়েছে। পাকিস্তানের প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই স্থাপনার ইতিহাস সপ্তম থেকে একাদশ শতাব্দীর শুরুর সময় পর্যন্ত বিস্তৃত।

সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা

পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে চলমান উদ্বেগের মধ্যেই রামলীলা মন্দিরের ঘটনা সামনে এসেছে।

দেশটির মানবাধিকার কমিশন (এইচআরসিপি) ইটিপিবির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি সংস্থাটির কাঠামোয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।

এইচআরসিপির ‘স্যাংচুয়ারি ডিনাইড: ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন অর বিলিফ ইন ২০২৫/২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন, ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার, জোরপূর্বক বিয়ে ও ধর্মান্তর এবং বৈষম্যের অভিযোগ। প্রতিবেদনে হিন্দু ও খ্রিষ্টান মেয়েদের অপহরণ ও জোরপূর্বক বিয়ের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে গত ১১ অক্টোবর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে খাইবার পাখতুনখোয়ায় গভর্নরের শাসন জারি করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার। ইমরান খানের দল পরিচালিত প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাসবাদ দমনে যথাযথ সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

সব মিলিয়ে, রামলীলা মন্দির ভাঙার উদ্যোগ আপাতত বন্ধ হলেও স্থাপনাটির মালিকানা এবং সেখানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। মন্দিরটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্বচ্ছ তদন্ত ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button