‘খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে সৌদি গিয়েছিলাম, কিন্তু আমি মুসলিম হয়ে ফিরলাম’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পরিবারের সদস্যদের অনেকেই গির্জার সঙ্গে যুক্ত, এমনকি তাঁর এক বোন ছিলেন সন্ন্যাসিনী। ধর্মীয় অনুশাসনে গড়ে ওঠা সেই নারী একসময় খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা প্রচারের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান সৌদি আরবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইসলামের শিক্ষা, পবিত্র কুরআনে ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.)-এর মর্যাদা এবং পাহাড়ের বুক চিরে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি তাঁর চিন্তাজগতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করে।
দীর্ঘদিনের প্রশ্ন, আত্মিক অনুসন্ধান, পারিবারিক আপত্তি ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন সিস্টার ডেইজি। তাঁর ইসলাম গ্রহণের এই ঘটনাকে ঘিরে প্রচলিত বর্ণনায় উঠে এসেছে বিশ্বাস ও সত্য অনুসন্ধানের এক দীর্ঘ যাত্রার কথা।
ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা, মনে ছিল নানা প্রশ্ন
সিস্টার ডেইজির বেড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ধর্মপ্রাণ আইরিশ ক্যাথলিক পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই গির্জার প্রার্থনা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং খ্রিস্টীয় বিশ্বাস ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তাঁর এক বোন কারমেলাইট সন্ন্যাসিনী ছিলেন। পরিবারের কয়েকজন চাচাও যাজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
তবে ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে উঠলেও খ্রিস্টধর্মের কিছু বিশ্বাস নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ত্রিত্ববাদ এবং যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ধারণা তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। ঈশ্বরের সর্বশক্তিমান সত্তা এবং যিশুর মৃত্যুর বিষয়টি কীভাবে একসঙ্গে ব্যাখ্যা করা যায়, তা নিয়ে তিনি উত্তর খুঁজতেন।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধান করতে গিয়েই ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার আগ্রহ তৈরি হয়।
খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যাত্রা
পরবর্তী সময়ে গির্জার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং মার্কিন দূতাবাসে চাকরির সুবাদে সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পান ডেইজি। সেখানে খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা প্রচারের পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। তাঁর ধারণা ছিল, আরবের মুসলমানদের কাছে যিশু ও মরিয়ম সম্পর্কে খ্রিস্টীয় বিশ্বাস তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু সৌদি আরবে গিয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে তাঁর ধারণায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। তিনি জানতে পারেন, ইসলামে ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.) অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। পবিত্র কুরআনেও তাঁদের জীবন ও মর্যাদা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
এসব বিষয় জানার পর তাঁর মনে নতুন করে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে গির্জার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলেও নিজের সব প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি বলে তাঁর জীবনকাহিনিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও গভীর হয়।
তায়েফের পাহাড়ে আজানের ধ্বনি যে প্রভাব ফেলেছিল
সৌদি আরবের তায়েফ অঞ্চলের পাহাড়ি পরিবেশ ডেইজির জীবনে বিশেষ স্মৃতি হয়ে রয়েছে বলে বর্ণনায় উঠে এসেছে। পাহাড়ের চারপাশ থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলত। মুসলমানদের ইবাদত, আল্লাহর প্রতি তাঁদের নিবেদন এবং ধর্মীয় জীবনের চর্চা তাঁর মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিত।
যে দেশে তিনি গিয়েছিলেন খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা প্রচার করতে, সেখানেই ইসলাম সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তা করতে শুরু করেন তিনি। কুরআনে ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.)-এর মর্যাদা, মুসলমানদের বিশ্বাস এবং আজানের সুর—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর সত্য অনুসন্ধানের আগ্রহ বাড়তে থাকে।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেলেও সৌদি আরবের সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর প্রভাব রেখে যায়। ইসলাম সম্পর্কে আরও জানার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে তাড়িত করতে থাকে।
সাত বছরের সংগ্রাম, পরিবারের আপত্তি
যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসার পর বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘দ্য মেসেজ’-এর একটি অংশ দেখার পর ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও বাড়ে ডেইজির। তিনি ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং দীর্ঘদিনের প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে থাকেন।
তাঁর এই আগ্রহ পরিবারের সদস্যদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। বিশেষ করে সন্ন্যাসিনী বোন তাঁর সম্ভাব্য ধর্মান্তরের বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। তাঁকে বিভিন্ন সন্ন্যাসী, যাজক ও বিশপের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে তিনি নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় সাত বছর ধরে তাঁকে নানা প্রশ্ন, আলোচনা ও পারিবারিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। নিয়মিত ধর্মীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা চলত। একপর্যায়ে এক সন্ন্যাসী তাঁর দেওয়া ইংরেজি কুরআন ক্ষুব্ধ হয়ে ছুড়ে ফেলেছিলেন বলেও বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে এসব বাধা তাঁর অনুসন্ধান থামাতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও দৃঢ় হয়। বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় ওই সন্ন্যাসী নিজের আচরণের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন এবং ডেইজির কাছে ক্ষমা চান।
ফাদার টমের পরামর্শে নতুন করে ভাবার সুযোগ
দীর্ঘ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে ডেইজিকে ফাদার টম নামের একজন যাজকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তাঁর সঙ্গে আলোচনার পর ডেইজি হয়তো নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন।
কিন্তু বর্ণনা অনুযায়ী, ফাদার টম তাঁকে সত্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে নিজের বিবেক ও উপলব্ধিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। অন্যের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে বিষয়গুলো নিজে বোঝার চেষ্টা করতে বলেন তিনি।
এই পরামর্শ ডেইজির চিন্তায় প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন, সেগুলো নিয়ে স্বাধীনভাবে ভাবার সুযোগ পান। ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হতে থাকে।
প্রথম সিজদায় আবেগাপ্লুত ডেইজি
অবশেষে ডেইজি তাঁর ছোট দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে একটি ফিলিস্তিনি মসজিদে যান। সেখানে এক ফিলিস্তিনি নারী তাঁকে নামাজ আদায়ের নিয়ম শেখাতে সহায়তা করেন। এরপর প্রথমবারের মতো মুসলমানদের নিয়মে নামাজ পড়েন এবং আল্লাহর সামনে সিজদায় অবনত হন বলে তাঁর জীবনকাহিনিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই মুহূর্তটি ছিল তাঁর জীবনের আবেগঘন একটি অধ্যায়। বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম সিজদায় গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। দীর্ঘদিনের প্রশ্ন, দ্বিধা ও অনুসন্ধানের পর সৃষ্টিকর্তার সামনে আত্মসমর্পণের অনুভূতি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
যে নারী একসময় খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তী সময়ে ইসলামের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন। তাঁর কাছে এই পরিবর্তন ছিল জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
ইসলাম গ্রহণের পর ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে উপলব্ধি
ডেইজির ইসলাম গ্রহণের পেছনে ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে তাঁর জীবনকাহিনিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। ঈসা (আ.) আল্লাহর সম্মানিত নবী ও রাসুল এবং মরিয়ম (আ.) পবিত্র ও মর্যাদাবান নারী। পবিত্র কুরআনে তাঁদের জীবন, ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম এবং তাঁর নবুওয়ত সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে।
ডেইজির কাছে এই বিষয়গুলো ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শৈশব থেকে যেসব ধর্মীয় প্রশ্ন তাঁকে ভাবিয়ে তুলত, ইসলামের শিক্ষা সেগুলো নতুনভাবে বোঝার সুযোগ করে দেয় বলে বর্ণনায় তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া, পরবর্তী সময়ে ডেইজির জীবনযাপনে পরিবর্তন দেখে তাঁর মেয়েও ইসলাম গ্রহণ করেন বলে ওই বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে।
সত্য অনুসন্ধানের দীর্ঘ এক যাত্রা
সিস্টার ডেইজির ইসলাম গ্রহণের এই কাহিনিতে উঠে এসেছে ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা, প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, ভিন্ন বিশ্বাস সম্পর্কে জানা এবং পারিবারিক বাধা অতিক্রম করার অভিজ্ঞতা।
সৌদি আরবে কাটানো সময় থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা এবং প্রথম সিজদার অভিজ্ঞতা—প্রতিটি পর্যায় তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
তবে তাঁর জীবনকাহিনির বিভিন্ন ঘটনা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার স্বাধীনভাবে যাচাই করা সূত্র এখানে উল্লেখ নেই। তাই এসব বিবরণকে প্রচলিত জীবনকাহিনির তথ্য হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।



