পশ্চিমবঙ্গে ‘জলকে পানি’ ও ‘মা-কে আম্মা’ বলা যাবে না: শুভেন্দু অধিকারী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ভাষা ও ধর্মকে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘মা’কে আর ‘আম্মা’ বলা যাবে না এবং ‘জল খাব’ কখনো ‘পানি খাব’ হবে না। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে দুই বাংলার ভাষাপ্রেমী ও সচেতন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও সমালোচনা করেন শুভেন্দু। পাশাপাশি অতীতে মহালয়ার দিনে মা কালীকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শুভেন্দুর ভাষা-সংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচকদের মতে, ‘জল’ ও ‘পানি’ কিংবা ‘মা’ ও ‘আম্মা’—শব্দগুলোকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দেখার প্রবণতা ভাষার স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে সংকুচিত করে। তাঁদের অভিযোগ, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে ভাষা ও ধর্মকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভাষাবিদ ও ভাষাপ্রেমীদের আলোচনায় বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারের বৈচিত্র্য প্রায়ই উঠে আসে। বাংলা ভাষা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃত, আরবি, ফারসি এবং বিভিন্ন দেশি ভাষার শব্দ গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলে একই অর্থ প্রকাশে একাধিক শব্দের ব্যবহার বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
‘জল’ ও ‘পানি’ শব্দ দুটিও বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত। অঞ্চল, পারিবারিক পরিবেশ ও কথ্য ভাষার ধরন অনুযায়ী শব্দ দুটির ব্যবহার ভিন্ন হতে পারে। সাহিত্যেও দুই শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। কাজী নজরুল ইসলাম ও পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের রচনাসহ বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় মানুষের দৈনন্দিন ভাষার এই বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হয়েছে।
একইভাবে ‘মা’ ও ‘আম্মা’—দুটি শব্দই মাতৃসম্বোধনে ব্যবহৃত হয়। পরিবার, অঞ্চল ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল অনুযায়ী মানুষ ভিন্ন ভিন্ন সম্বোধন ব্যবহার করেন। শব্দের এই পার্থক্য থেকেই কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের সমালোচকদের একাংশের মতে, ‘জল’কে হিন্দু পরিচয় এবং ‘পানি’কে মুসলিম পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভাষার বহুমাত্রিক চরিত্রকে উপেক্ষা করে। তাঁদের মতে, বাংলা কোনো একক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়; বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সম্মিলিত চর্চায় এ ভাষার বিকাশ ঘটেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, বেকারত্ব, দুর্নীতি ও অন্যান্য আর্থসামাজিক সমস্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে জনদৃষ্টি সরিয়ে ভাষা ও ধর্মকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি করা হতে পারে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তবে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের পেছনে এমন উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
সব মিলিয়ে, ‘জল’ ও ‘পানি’ কিংবা ‘মা’ ও ‘আম্মা’ নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য ভাষার ব্যবহারকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ বিতর্কে একদিকে রয়েছে তাঁর বক্তব্য, অন্যদিকে রয়েছে ভাষার ঐতিহাসিক বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্ব রক্ষার পক্ষে সমালোচকদের যুক্তি।



