নারী দায়িত্ব নিলে কম ব্যথা পায় পুরুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শারীরিক ব্যথা অনুভব করা ও তা প্রকাশের ক্ষেত্রে পরীক্ষকের লিঙ্গ প্রভাব ফেলতে পারে। সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষ পরীক্ষকের তুলনায় নারী পরীক্ষকের উপস্থিতিতে পুরুষ অংশগ্রহণকারীরা একই মাত্রার ব্যথা তুলনামূলক কম অনুভব করেছেন। অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের ব্যথা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক এবং অ্যানেসথেশিওলজি ও নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের পরামর্শক আনা সেলগ্রেন ইংস্কভ জানান, গবেষণায় নারী ও পুরুষ পরীক্ষকের পোশাক এবং বক্তব্য একই রকম রাখা হয়েছিল। এরপরও পরীক্ষকের লিঙ্গের সঙ্গে ব্যথার অনুভূতির পার্থক্য পাওয়া যায়।
গবেষণাটির শিরোনাম ‘Perception of nociceptive pain – perspectives on induction, evaluation and gender’। এতে ব্যথা সৃষ্টি, মূল্যায়ন এবং লিঙ্গভিত্তিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা চালানো হয়।
প্রথম পরীক্ষায় সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীদের পায়ের পাতার ওপরের অংশে লেজারের সংক্ষিপ্ত স্পন্দন প্রয়োগ করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যথার সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়ুতন্তুর প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা। এ সময় দেখা যায়, পুরুষ অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে নারী পরীক্ষক ব্যথার উদ্দীপনা দিলে একই মাত্রার ব্যথা অনুভব করাতে তুলনামূলক বেশি তীব্র উদ্দীপনার প্রয়োজন হচ্ছিল।
এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গবেষকেরা দ্বিতীয় একটি পরীক্ষা পরিচালনা করেন। এতে অংশগ্রহণকারীদের হাতে একটি ছোট যন্ত্র দেওয়া হয়, যার বোতাম চাপলে মৃদু বৈদ্যুতিক প্রবাহ তৈরি হতো। ব্যথা অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বোতাম ছেড়ে দিতে বলা হয় তাঁদের।
পরীক্ষাটি দুই দফায় সম্পন্ন করা হয়—একবার নারী পরীক্ষকের উপস্থিতিতে এবং অন্যবার পুরুষ পরীক্ষকের উপস্থিতিতে। ফলাফলে দেখা যায়, নারী ও পুরুষ উভয় অংশগ্রহণকারীর ক্ষেত্রেই নারী পরীক্ষকের উপস্থিতিতে ব্যথা অনুভবের সীমায় পরিবর্তন এসেছে। একই মাত্রার ব্যথা সৃষ্টি করতে তখন তুলনামূলক বেশি তীব্র উদ্দীপনার প্রয়োজন হয়েছে।
এরপর গবেষকেরা অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের মধ্যেও পরীক্ষকের লিঙ্গের প্রভাব অনুসন্ধান করেন। সুইডেনের স্কোনে ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের তিনটি অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ওয়ার্ডের ২৪৫ জন রোগীর ওপর এ গবেষণা চালানো হয়। অস্ত্রোপচারের অল্প সময় পর একজন নারী ও একজন পুরুষ গবেষক রোগীদের ব্যথার বিষয়ে জানতে চান।
আনা সেলগ্রেন ইংস্কভের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরুষ রোগীরা নারী গবেষকের কাছে ব্যথার কথা জানালে তাঁদের ব্যথার মাত্রা তুলনামূলক কম পাওয়া যায়। তবে নারী রোগীদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পার্থক্য দেখা যায়নি।
তিনি আরও জানান, সামগ্রিকভাবে পার্থক্যটি খুব বেশি ছিল না। তাই রোগীদের পুরো গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব সীমিত হতে পারে। তবে কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ব্যথা এত তীব্র হলে যে তাঁরা নিজেরাই ব্যথানাশক ওষুধ চাইছেন, তখন এ পার্থক্য চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, নারীদের সহমর্মিতা প্রকাশের ধরন, হাসি কিংবা সরাসরি চোখের দিকে তাকানোর মতো অমৌখিক যোগাযোগের বিষয়গুলো এ ফলাফলের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে এসব আচরণই গবেষণায় পাওয়া পার্থক্যের কারণ কি না, তা নিশ্চিত নয়।
গবেষণাটির প্রধান তত্ত্বাবধায়ক এবং মালমোর এসইউএস হাসপাতালের অ্যানেসথেশিওলজি ও নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক অধ্যাপক ইয়োনাস ওকেসন বলেন, সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর পরীক্ষামূলক গবেষণা এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীদের নিয়ে ক্লিনিক্যাল গবেষণা—উভয় ক্ষেত্রেই এ ধরনের ফলাফলের পক্ষে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ দিয়েছে।
তাঁর মতে, রোগীর ব্যথা মূল্যায়নের সময় পরীক্ষক ও রোগীর লিঙ্গের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করতে সহায়তা হতে পারে।
তবে গবেষণার ফলাফলকে সব পুরুষ বা সব পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। ব্যথার অনুভূতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, আর পরীক্ষকের লিঙ্গের পাশাপাশি অন্যান্য মানসিক ও সামাজিক উপাদানও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।



