বাংলাদেশ

শাকিলের জানাজায় বক্তব্যের সময় এমপির উদ্দেশে ভুয়া ভুয়া স্লোগান

বাংলা টিভি ডেস্ক: নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলামের জানাজায় বক্তব্য দিতে গিয়ে উপস্থিত মুসল্লিদের একাংশের তোপের মুখে পড়েছেন নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। এ সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন উপস্থিত কয়েকজন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে গুরুদাসপুরের শহীদ শামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ মাঠে জানাজার সময় এ ঘটনা ঘটে।

শাকিল হত্যা মামলায় সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়ার পর এ ঘটনা ঘটে। মিন্টুর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

জানাজায় বক্তব্য দিতে গিয়ে আব্দুল আজিজ বলেন, ‘প্রিয় ভাইয়েরা আমার, আমার একটা কথা শুনতে হবে দাদারা।’ তাঁর এ বক্তব্যের পরপরই উপস্থিত নেতাকর্মী ও মুসল্লিদের একাংশ ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।

এ সময় সংসদ সদস্য ঘোষণা দেন, হত্যাকাণ্ডে তাঁর ছেলে জড়িত থাকলেও তিনি ছেলের পক্ষ নেবেন না; বরং নিহত শাকিলের পরিবারের পাশে থাকবেন।

পরে জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ছাত্রদলের রাজনীতির মধ্য দিয়েই তিনি বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছেন। তাই ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে।

নিহতের পরিবারের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ২০ লাখ টাকা সহায়তার ঘোষণা দেন সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। তবে এ ঘোষণার পরও সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে মুসল্লিদের একটি অংশ মিছিল নিয়ে চাঁচকৈড় বাজারে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সময় আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলের মালিকানাধীন ‘রাশ আরবান স্টাইল’ নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ দোকান থেকে মালামাল নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে জানান। তবে এ ঘটনায় কারা জড়িত এবং কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এদিকে শাকিল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন।

বহিষ্কারসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মিন্টুর ব্যক্তিগত কোনো অপকর্মের দায় দল নেবে না। একই সঙ্গে যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে তাঁর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যেভাবে হামলার শিকার হন শাকিল

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন শাকিল। নূর একাডেমির সামনে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুই যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলে মোটরসাইকেলে করে তাঁকে ধাওয়া করা হয়।

পরে শহিদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তাঁকে ধরে চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। স্থানীয়রা প্রথমে তাঁকে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাত ৮টার দিকে ১২ দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।

শাকিলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মঙ্গলবার সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা হাসপাতালে যান। দুপুর ২টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে রাত ৮টার দিকে মরদেহ গুরুদাসপুরে পৌঁছায়। শহীদ শামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পুরানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন, হামলার পর থেকেই তিনি পরিস্থিতির খোঁজখবর রেখেছেন এবং শাকিলের চিকিৎসার খরচ বহন করেছেন। তবে শাকিল মারা যাবেন, তা তিনি ধারণা করেননি।

তিনি আরও জানান, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর ছেলে কিংবা অন্য কেউ—তদন্তে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে আইনের আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।

মামলার তদন্ত ও রিমান্ড

গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান জানান, গত ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল করিম থানায় মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদেরও শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানান, শাকিল হত্যা মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হাজির করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁর ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

শাকিল হত্যাকাণ্ডের বিচার, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং জানাজা-পরবর্তী হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়ে এখন পুলিশের তদন্তের দিকেই নজর রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button