আন্তর্জাতিকইন্ডিয়া

শতবর্ষী মসজিদ সরাতে চায় মোদি সরকার, বিকল্প জায়গা নিয়ে প্রশ্ন আদালতে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কৃষি ভবন এলাকায় অবস্থিত শতবর্ষী কাদেমি মসজিদ সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে দিল্লি হাইকোর্টে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি স্থাপনার ভেতরে স্থায়ী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থাকা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার।

তবে মসজিদটি অন্যত্র সরানো হলে বিকল্প জায়গা বরাদ্দের বিষয়ে কী বিধান রয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন দিল্লি হাইকোর্ট। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যাও চেয়েছেন বিচারপতি।

সেন্ট্রাল ভিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি ভবন ও পাশের শাস্ত্রী ভবন ভেঙে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে কৃষি ভবন চত্বর থেকে কাদেমি মসজিদ সরানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে কেন্দ্র। সরকারের যুক্তি, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত কেন্দ্রীয় সরকারের এই অবস্থানের মধ্য দিয়ে মসজিদটি বর্তমান অবস্থান থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন আগামী ২৩ নভেম্বর নির্ধারণ করেছেন আদালত।

কৃষি ভবনের আগেই ছিল মসজিদটির অস্তিত্ব

কাদেমি মসজিদের দীর্ঘ ইতিহাস কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তিকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন রাজধানী নির্মাণের জন্য জমি জরিপ শুরু হয়। সে সময়ের সরকারি নথিতেও মসজিদটির অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়।

১৯১২ সালে ব্রিটিশ স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্স নয়াদিল্লির পরিকল্পনা তৈরির সময় যে সরকারি মানচিত্র প্রস্তুত করেছিলেন, সেখানেও কাদেমি মসজিদের অবস্থান চিহ্নিত ছিল। অর্থাৎ, ১৯৫৭ সালে কৃষি ভবন নির্মাণের অনেক আগে থেকেই ওই স্থানে মসজিদটি বিদ্যমান ছিল।

এ ছাড়া ১৯৭০ সালের দিল্লি সরকারি গেজেটেও কাদেমি মসজিদকে বৈধ ও তালিকাভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে কেন্দ্র

সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ছয়টি মসজিদের সুরক্ষা চেয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছিল দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড।

সে সময় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানিয়েছিলেন, প্রকল্পের কারণে এসব ধর্মীয় স্থাপনার কোনো ক্ষতি করা হবে না। পাশাপাশি প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি এবং তখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

তবে সাম্প্রতিক শুনানিতে কেন্দ্রের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা গেছে। এবার মসজিদটি সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক যুক্তি তুলে ধরেছে সরকার।

বিকল্প জায়গা নিয়ে কেন্দ্রের কাছে ব্যাখ্যা চাইলেন বিচারপতি

শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনজীবী নিশান্ত গৌতমের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি দয়াল জানতে চান, কোনো ধর্মীয় স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প জায়গা দেওয়ার বিষয়ে কী ধরনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, সব ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রেই কি বিকল্প জায়গা দেওয়ার বিধান নেই, নাকি সরকারি সম্পত্তিতে কোনো সম্প্রদায়ের প্রার্থনার স্থান থাকাই গ্রহণযোগ্য নয়—এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বিচারপতি আরও বলেন, সরকারি সম্পত্তিতে ধর্মীয় স্থাপনা থাকা অননুমোদিত—কেন্দ্রীয় সরকারের এই বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ ও আইনি প্রভাব স্পষ্ট হওয়া জরুরি। বিষয়টি পরিষ্কার হলে আদালতের পক্ষে এ বিষয়ে আইনি অবস্থান নির্ধারণ সহজ হবে।

সব মিলিয়ে কাদেমি মসজিদ সরানোর বিষয়টি এখন আর কেবল সেন্ট্রাল ভিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে মসজিদটির শতবর্ষী ইতিহাস, ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি, ধর্মীয় অধিকার এবং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার সাংবিধানিক ব্যাখ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংশ্লিষ্ট খবর

Back to top button